ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি/ রঙ্গনা পাল
আরো একটা দিন কেটে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত্রে শুতে যাওয়া পর্যন্ত বাঁধাধরা কাজ ছাড়াও আরও কত কাজ থাকে যেগুলো করা হয়ে ওঠে না সময়ের অভাবে। অথচ বৃথা কাটিয়ে দেওয়ার মত প্রচুর সময়ের হিসেব মেলাতে পারে না রাজন্যা। আসলে মনের মধ্যে যখন ভাবনা বাসা বাঁধে, তখন দিন রাত অহ পক্ষের দিশা খুঁজে পাওয়া যায় না, শুধু মনে হয় সব হিসেবের বাইরে চলে যাচ্ছে। অবশ্য জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের সাথে সহবাস করতে করতে সব সয়ে গেছে ওর। এখন আর কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না । সাতদিন হয়ে গেল স্বাধীনের খোঁজ নেই। একটা ফোন করার প্রয়োজন বোধ করে না অন্তত ছেলেটার একটা খবর নিতে পারতো। মনে হয় সে খুব ভালো আছে। ভালো থাক্ সবসময়। এদিকে এত ছুটি আ্যাপ্রুভ করলো না হাসপাতাল কতৃপক্ষ। মাথাটা পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিল। ভাগ্যিস অনুপমের অনুরোধে কাউন্সিলিংটা করিয়েছিল, না হলে হয়তো এতদিনে পাগল হয়ে যেত। শাশুড়ি কম চেষ্টা করেনি। একমাত্র ওষুধ-ই তাকে পাগলাগারদে যাওয়া থেকে আটকেছে।
কাজের মেয়ে রেণুকা ছুটি নিয়েছে। মাস যেতে না যেতেই ওর ছুটির প্রয়োজন পড়ল। ওর স্বামী ওকে ছেড়ে চলে গেলেও কেবল মাঝে মাঝে আসে তোলা আদায় করতে। সেই স্বামী নাকি এবার এসেছে অস্বাভাবিক শরীর খারাপ নিয়ে। যতই হোক স্বামী তো। তার সেবা করার জন্য দুটো দিন ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে রেণুকা। রাজন্যা ভাবলো এই সুযোগে একবার ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি ঘুরে আসবে। তারপর না হয় চাকরির ব্যাপারে ডিসিশন নেবে। মনটাও খুব খারাপ। বোন আর বোনের বর রয়েছে ওখানে। তাছাড়া জন্মাবার পর থেকে ভাই-এর ছেলের মুখ দেখা হয়নি। সেটাও হবে। পাশের ফ্ল্যাটে কী মনে করে চাবি রেখে গেলো, যদি রেণুকা ফিরে আসে। দুটো দিন বাপেরবাড়িতে কাটিয়ে আবার ফ্ল্যাটে ফেরার মুখে দূর থেকে দেখতে পেল বহু মানুষের জটলা। বুকের ভেতরটা মোচড়াতে শুরু করল। সকাল থেকেই ডানচোখের পাতাটা তির তির করে কাঁপছিল, কুসংস্কারে আমল না দিলেও সামান্য অস্বস্তি তখন থেকেই রয়ে গেছে। এখন সন্দেহের আঁচ দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হল। সে দ্রুত ফ্ল্যাটের সামনাসামনি আসতেই দেখে তার ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পাশাপাশি ফ্ল্যাটের লোকেরা দেখেছে রাজন্যার হাজব্যান্ড ফ্ল্যাট থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল কিন্তু জানলার গ্রিলের কপালের সাথে ঠোক্কর খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। তারপর থেকে তাকে উঠতে দেখা যায়নি। সেটাও প্রায় আধঘন্টা হবে।
রাজন্যা হয়তো কমদিন এখানে এসেছে। তবু তার ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ। নার্স বলে তার খাতিরও খুব। একে ওকে এরমধ্যে অনেক ওষুধ দিয়ে সাহায্য করেছে। গতকাল রাত্রে এই ভদ্রলোক ফ্ল্যাটে এসে বলেছে সে রাজন্যার স্বামী। ফ্ল্যাটে তালা দেওয়া থাকবে এটা নাকি সে অনুমান করতে পারেনি। পাশের ফ্ল্যাটে টোকা দিলে, শমিকবাবু বেরিয়ে আসতেই স্বাধীন জিজ্ঞেস করে-
- এখানে তালা কেন?
-ম্যাডাম গতকাল তার বাপেরবাড়ি গিয়েছেন। আগামীকাল ফিরবেন বলে গেছেন।
-ওহ্! চাবি সাথে নিয়ে গেছে?
-না, আমার কাছে রেখে গেছেন। যদি কাজের মেয়ে ফেরৎ আসে সেই ভেবে।
-কিন্তু ওকে যে আমার খুব দরকার। কিছু জরুরি কথা না বললেই নয়।
-আপনি একবার ফোন করে নিন।
-আমি তো বাড়ি থেকেই ফোনটা আনতে ভুলে গেছি। নয়তো আপনাকে বিরক্ত করতাম না।
-এই নিন। আমারটা থেকে কথা বলে নিন।
-আচ্ছা বেশ, আপনি তাহলে রিং করুন, আমি কথা বলে নিচ্ছি।
শমিক রাজন্যাকে রিং করলো কিন্তু পেলো না। নেটওয়ার্ক বিজি বলছে। অগত্যা স্বাধীনকে বলতে হলো-
-ফোনে পাচ্ছি না। আপনি না হয় আজ রাতটা আমাদের অতিথি হয়ে থেকে যান।
-না, না আমি রাতটা ফ্ল্যাটে কাটিয়ে দিই। ওর ফেরার অপেক্ষা করতে থাকি। ওর সাথে কথা বলে কাল সকালে ফিরে যাব।
-আপনি এখানে এসে থাকেন না কেন?
-আসলে একটু সমস্যায় পড়েছি। আশা করছি কিছুদিনেই মিটে যাবে। আচ্ছা চাবিটা দেওয়া যাবে?
-না, মানে..ম্যাডামকে ফোনে পেলাম না, যদি কিছু বলেন.....ওঁর একটা মতামতের প্রয়োজন ছিল।
-বেশ, আমি চলে যাচ্ছি। কাল না হয় আবার আসবো।
-আচ্ছা দাঁড়ান...
আরো বেশ কয়েকবার ফোন করে যখন পেলো না তখন বাধ্য হয়ে শমিকবাবু ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে চাবির গোছা ধরিয়ে দিয়েছেন।
কথাপ্রসঙ্গে শমিকবাবু জেনে নিয়েছেন স্বাধীনের মা'র সাথে নাকি তার বউ-এর মনকষাকষি চলছে। তাই একসাথে থাকা হয় না, তবে খুব তাড়াতাড়ি মা'র সাথে বিবাদ মিটিয়ে এখানে এসে থাকবে এমনটাই ঠিক করেছে। রাজন্যার সাথে ফ্ল্যাটে সেই প্রথমদিন একবার মাত্র এই ভদ্রলোককে দেখা গিয়েছিল। তারপর আর একটিবারও দেখা যায়নি, হঠাৎ আজ উদয় হয়েছে। রাজন্যাকে একা দেখেও শমিকবাবু কখনও তার ব্যক্তিগত জায়গায় ঢুকতে চাননি, তাই কোন প্রশ্ন করূননি। আজ একে চাবি দিতে মন না চাইলেও দিতে বাধ্য হল তার কথাবার্তায়। যদি চাবি না দেওয়ার জন্য রাজন্যা আবার দুঃখিত হয়! অতঃপর স্বাধীনের হাতে চাবি তুলে দিতে হয়েছে। সে যে সুইসাইডাল টেনডেনসি নিয়ে এসেছে সেটা জেনে নিজেকে এখন ভীষণ অপরাধী মনে করছে। এখন রাজন্যাকে কিভাবে ফেস করবে বুঝতে পারছে না। ওই তো ম্যাডাম এসে গেছেন....
..... এরপর আগামী সপ্তাহে...
0 মন্তব্যসমূহ