হতচ্ছাড়ি বদমাইশ মেয়ে ওঠ্....কী রে ভোঁদড়ের মতো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস....ওঠ্....বাসি কাজ করবে কে রে? আর জলখাবার? আমরা কি পেটে গামছা বাঁধবো না কি রে? সক্কাল সক্কাল মায়ের বীভৎস চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেলো রাজন্যার। যদিও এটা নৈমিত্তিক ঘটনা তবু এই ভোরটা তার কাছে ছিলো আবেশের, ঘোরের এবং প্রাপ্তির। চোখ খোলার আগেই পরনের নাইটিটা ধরে হ্যাঁচকা টান মেরেছে তার গর্ভধারিণী!! রবি ঠাকুরের কৃষ্ণকলির মা কেমন ছিলো কে জানে! এবার না উঠে আর উপায় কী! এমন লক্ষ্মীমন্ত মুখের হতশ্রী ভাষায় ভুজনোর ভাত বেরিয়ে আসার উপক্রম! কাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি তাই কষ্ট করেও ঢেকুর তোলা গেলো না। অগত্যা ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের নাম স্মরণ করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায় রাজন্যা। শরীরটা কেমন ম্যাজ-ম্যাজ করছে যেন। এগোতে গিয়ে দুর্বলতা টের পেয়ে সামান্য থামতেই, তার মুখের উপর আধভেজা সব ঘরগুষ্টির কাপড় চোপড় এসে পড়লো। রাজন্যা ভাবতেই পারেনি যে তার মা জননী যে কাপড়গুলো কলতলায় রাখার কথা সেগুলো এখানে নিয়ে এসে তার মুখে ছুড়ে মারবে! ধরণী দ্বিধা হলে হয়তো মুক্তি পেতে পারতো, সে তো সীতা নয় তাই পরিস্থিতি সামলানোর অভ্যেস রপ্ত করতে হচ্ছে।
সকালের সমস্ত কাজ সেরে চা আর দুটো বিস্কুট খেয়ে বই নিয়ে বসেছে এমন সময় মা'র হাঁক। সামনেই মাধ্যমিক। পড়তে বসলেই কোন না কোন কারণে হাঁক ডাক শুরু হয়ে যায়। সাড়া দিতে দেরি হওয়ায় আবার চিৎকার -
-কি রে রাজি, শুনতে পাচ্ছিস না রে বড়
- হ্যাঁ, বলো
-বাজারে যা
-বাবা তো আছে
-কাল ভিজে তোর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
-আর আমাকে যে ঘরে ঢুকতেই দিলে না, আমি খুব ভালো আছি? খেতে দাওনি পর্যন্ত।
-কেন রে, আমার মাথাটা খেয়ে শান্তি হয়নি বুঝি?
- তোমার মাথা খেলে ভাই বোনকে কে যত্ন করে মানুষ করবে মা?
- তোর চোদ্দপুরুষ
-একপুরুষেই প্রাণ বাঁচে কি না তার গ্যারেন্টি নেই আবার চোদ্দপুরুষ..
-ধিঙ্গিপনা বেড়েছে না, তোর সাথে কথা বলতেই আমার রুচিতে বাঁধে
-হা হা হা হা...শুধু কাজ করাতে কোন রুচি লাগে না বলো?
এই মেয়ের খুব মুখ চলে, পেরে ওঠা দায়। অপমানও হজম করে নেয়। যমের অরুচি একেবারে। গজগজ করতে করতে ঝটপট বাজারের থলি আর ফর্দ টাকা সহ ধরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেলো মা।
বাজারটা একটু দূরেই, তবু হাঁটা শুরু করলো রাজন্যা। কী হবে তাড়াহুড়ো করে। স্কুল ছুটি থাকলে গায়ে গতরে এই কালো মেয়েটিকে শ্রম দিতে হয় শুধুমাত্র নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। গান শেখার জন্য অনেক জেদ করার পর একটা স্কুল ঠিক করে দিয়েছিলো বাবা, তবে রেওয়াজ করার জন্য পরিবেশ দেয়নি। পড়াশোনা করতে বসলে তো হাজার রকম কাজে জড়িয়ে দেওয়া হয়। বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই, স্কুল থেকে ফিরলেই ভাইবোনের দেখাশোনা করার গুরুদায়িত্ব। কোন বন্ধু-বান্ধবকে বাড়িতে আ্যালাও করা হতো না, যদিও রাজন্যার বন্ধুভাগ্য বেশ ভালোই। দশম শ্রেণিতে পড়ছে ঠিক, তবে সমবয়সীদের তুলনায় সে যেন একটু বেশিই বড়ো হয়ে গেছে। শরীরের চিহ্নগুলো বেশ প্রকট। পাশের বয়েজ স্কুলের ছেলেরা যেভাবে তাকায়, তখন আর নিজেকে কালো মনে হয় না, মনে হয় বাইরের খোলা জগৎটাই তার মুক্তির নিশানা। তাই এখন হাঁটতে মন্দ লাগছে না। ঘরের মধ্যে বরং দম বন্ধ হয়ে আসে।
বন্যা, ব ন ন্যা...
এই নামে তো মৃদুলদা ডাকে। সত্যি তো বামদিকের রাস্তাটা ধরে মৃদুলদা সাইকেল চড়ে বেল বাজাতে বাজাতে আসছে। মৃদুলদা প্রণয়ের সহপাঠী। রাজন্যা থামতেই, সে একেবারে সামনাসামনি এসে গেলো।
-মৃদুলদা তুমি?
-হ্যাঁ একটা কাজে এসেছিলাম, এবার ফিরবো।
- তুমি কোথায় যাবে?
-বাজারে।
-ওহ্! সাইকেলে বসো, পৌঁছে দিচ্ছি।
-নাহ্। চলে যাবো, আর তো সামান্য রাস্তা
-আচ্ছা, চলো তবে তোমার সাথে খানিক হাঁটি
-বেশ, চলো
-আর তো কদিন পরেই রথ
-হুম্
-পাশের গ্রামে এবার ইস্কনের রথ আনছে, বড়ো করে উৎসব হবে। আসবে তো?
-দেখি কী হয়!
-যদি প্রণয়কে সাথে নিয়ে আসি, তাহলে আসবে?
এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে! কালকের ঘটনাটা মুহূর্তে চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলো। মৃদুলদা জানে রাজন্যা প্রণয়কে পছন্দ করে। হয়তো তাই দেখা করাতে চাইছে। মৃদুলদা মানুষটা সবসময় হাসিখুশি, অনর্গল কথা বলে, আর হৈ চৈ করে ঘোরাঘুরি করতে ভালোবাসে। রাজন্যার সাথে যেচে আলাপ করতে এসেছিলো। প্রণয়ের সাথে কখনো তেমন কথা বলার সুযোগ হয়নি তবে মৃদুলদা ঠিক রাজন্যার মন পড়ে নিয়েছিলো। অনেকক্ষণ চুপ করে আছে দেখে মৃদুলদা আবার জিজ্ঞেস করলো-
-আসছো তো রথের দিন?
- জানি না
এটুকু বলেই তড়িঘড়ি বাজারে ঢুকে পড়লো রাজন্যা। মৃদুলদা আর তার নাগাল পেলো না।

0 মন্তব্যসমূহ