ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি
ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের চাকরিটা স্বাধীন সম্প্রতি নিয়েছে। হালদার'দের ব্যবসা বানিজ্যে যেমন উন্নতি তাতে স্বাধীন চাকরি না করলেও কিছু এসে যেত না, মোট কথা স্বাধীন চাকরিটা করছে শখে। তাছাড়া তাদের জমিজমা সম্পত্তির পরিমাণ প্রচুর। স্বাধীনের মা বেশ দাপটের সাথে রাজপাট চালান। বড় ছেলে হিসেবে স্বাধীনের অহংকারের পরিমাণটা একটু বেশি। তার আরো একটা শখ আছে সেটা হলো তার নাট্যদল। নিজে নায়কের অভিনয়ে পঁচিশেই খুব নাম কামিয়েছে। তার নায়ক সুলভ চেহারাটিও মহিলা সমাজের এক আলোড়ন বলা যায়। এপাড়া ওপাড়া বেপাড়া সব, সব পাড়াতেই তার অবাধ গতি। প্রণয়ের সাথে রাজন্যার ভেতরকার সম্পর্কটা স্বাধীন জানে। স্বাধীন আর প্রণয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ক। স্বাধীন এটাও জানে এদের সম্পর্কের সেতু মৃদুল। রাজন্যা কালো হলেও ওর বাড়বাড়ন্ত চেহারার আকর্ষণে অনেকের দৃষ্টি ছিলো। অনেকের মধ্যে স্বাধীন একজন। শুধু রাজন্যার কাছে পৌঁছতে পারছিলো না।
নাটক করতে এসে মেয়েদের শরীরের রহস্য পড়ে ফেলেছে স্বাধীন। এই লাইনে অভিনয়ের ছলে বারংবার স্বাদ পেয়েছে যোজনগন্ধার। নেশা বেড়ে গেছে, বেড়েছে ঈপ্সা চরিতার্থ করার কায়দা কানুন। যেকোন মেয়েকে নিজের করে পেতে বেশি সময় লাগে না তার। রাজন্যাকে এবার তার চাই। ভালোমানুষের মতো সেই ছক কষে চলেছে। এ ব্যাপারে মায়ের সাহায্য লাগবে তাই মাকে বলেছে, রাজন্যাকে ভালোবেসে ফেলেছে, বিয়ে করতে চায়। মাও তাতে সম্মতি জানিয়ে বলেছেন, "ওই মেয়ে সত্যি লক্ষ্মীমন্ত। আমারও খুব পছন্দ। এখন তো ট্রেনিং চলছে। চাকরি করলে বাড়তি টাকা আসবে ঘরে। তাছাড়া বাড়ির কাজেও হাত লাগাতে পারবে। রঙটা ময়লা, তবে এ বাড়িতে এলে রঙ পাল্টে যাবে। প্রয়োজনে আমি কথা বলবো, তুই নিশ্চিন্তে থাক।" এ ছেলে নিশ্চিন্তে থাকার ছেলে নয়। প্রণয়ের মতো গাঁইয়ে ছেলে যদি রাজন্যার নাগাল পায়, সে কেন নয়? ওদের সম্পর্কটা এখন আছে কিনা জানে না স্বাধীন; যদি থাকেও তবু এ সম্পর্কের বুকে বিচ্ছেদের পেরেক পুঁতে দেবে এমনই তার সংকল্প।
রাজন্যা ভেবেই মরে কেন স্বাধীন আর স্বাধীনের মা তার সাথে দেখা করতে চান। যতটুকু মনে পড়ে প্রণয় মৃদুলদার সহপাঠী ছিল। পড়ালেখার পাঠ শেষ করে এখন সে কী করে তাও জানে না, জানবার দরকার হয়নি বা কখনো। তেল আর জলের মতোই তাদের সম্পর্ক মেশবার নয় কখনো! তাহলে? কী এমন হলো যে দেখা করার ইচ্ছে বা কিছু বলার ইচ্ছে প্রকাশ করে গেলো! বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না। নির্দিষ্ট ঠিকানায় এক বিকেলে এলো স্বাধীন। রাজন্যা অবাক! বাবা! কী এমন প্রয়োজন! যাকগে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে কফি হাউসে এসে বসলো দুজনে। চা আর চিকেন পকোড়া ওর্ডার করে কথা শুরু করলো স্বাধীন-
-অনেকদিন ধরে বলবো করে বলতে পারিনি
-কী?
-ভীষণ পছন্দ করি তোমাকে
-কেন?
-তোমার সরলতার জন্য
-সে কী! বলো কী? এটাও বিশ্বাসযোগ্য কথা?
-শুধু আমি না, আমার মা ভীষণ পছন্দ করেন তোমায়।
- রাস্তাঘাট, উৎসব অনুষ্ঠানে অনেকবার দেখা হয়েছে, নাক তুলতে দেখেছি। স্নেহ দেখিনি কখনো।
রাজন্যার হাত দুটো ধরে এবার স্বাধীন বলে..
-দয়া করে ফিরিয়ে দিয়ো না। ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই..
স্বাধীন হাত দুটো ধরলো কিন্তু কোন অনুভূতি হলো না স্বাধীনের জন্য। ভাব ভালোবাসার কথা শুনলেও একটা আনন্দ হবার কথা হচ্ছে না তো! প্রণয়ের স্পর্শ লেগে আছে তার সর্বাঙ্গে। ওকে দেখলেই বুকের ভেতর হাজারটা প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়, দুম দুম করে ঢাক বাজে ভেতরে, হাত পা শিরশির করে। সারা শরীরে হাজার ভোল্টের কারেন্ট লাগে। কই স্বাধীনের মুখে ভালোবাসার কথা শুনে কোন উত্তেজনা হচ্ছে না তো...বরং কথাগুলো হজম করতে সমস্যা হচ্ছে। হোক সমস্যা তবু যাচা ধন আর কাচা কাপড় ছাড়ে কে? রাজন্যাও ছাড়বে না, সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে। প্রণয়ের অপমানের বদলা নেবে এবার। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ তবু তাকে পারতেই হবে। অনেক না পাওয়া আছে তার জীবনে। প্রণয় আর গান নিয়েই ছিলো এতকাল। ওদুটোই যখন তাকে ছেড়ে গেছে তখন সেই বা কেন স্মৃতি ধরে থাকবে। মনটাও বেগড়বাই করছে। বার বার প্রণয় এসে যাচ্ছে না চাইলেও...আবার সামনের সুযোগটাও হেলাফেলার নয়। মনে মনে ভাবে, আচ্ছা স্বাধীন সত্যি কথা বলছো তো? তার মত সুন্দর চেহারার ধনীর ছেলে তাকে পছন্দ করবে এতো ভাবনার বাইরে, আবার তার মা নাকি তাকে পছন্দ করেছে এটা আদৌ সত্যি তো? জিজ্ঞেস করতেও কিরকম অস্বস্তি হচ্ছে। না, না তাকে অপেক্ষা করতে হবে , এই মুহূর্তে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
অনেকক্ষণ ধরে উত্তর না পেয়ে স্বাধীন আবার বলতে শুরু করে-
-কিছু বলছো না যে- আমাকে তোমার পছন্দ নয় বুঝি?
উত্তরে রাজন্যা মুখ টিপে হাসে কেবল।
-বাহ্ তোমার হাসিটা বেশ সুন্দর। একদম টাটকা গোলাপের মতো।
এই প্রথম নিজের প্রশংসা শুনলো রাজন্যা। কিন্তু কেন জানে না একথাটাও তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলো। মুখে বললো-
-ধন্যবাদ তোমাকে। জানতাম না, জানলাম।
-কেন আয়নায় দেখনি নিজেকে?
- মুখ দেখেছি, হাসিমুখ দেখিনি।
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে চা পকোড়া শেষ করে রাজন্যা স্বাধীনকে বলে "চলো জলদি, সাতটা বেজে গেলে আর হোস্টেলে ঢুকতে পারবো না।"
বিল মিটিয়ে দিয়ে রাজন্যাকে নিয়ে কফি হাউস থেকে বেরিয়ে আসে স্বাধীন।
রাজন্যাকে হোস্টেলে রেখে গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় স্বাধীন। মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে তার। শাল্-লা এতো অনুনয় বিনয়, প্রেম নিবেদনের পরও ওই মেয়ে হ্যাঁসূচক কোন মন্তব্য করলো না! এতবড়ো অপমান মানতে পারছে না। জেদ চেপে গেলো তার। ওই মেয়েকে ফাঁদে না ধরা পর্যন্ত তার শান্তি নেই...
এরপর আগামী সপ্তাহে.....
-

0 মন্তব্যসমূহ