Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ধারাবাহিক উপন্যাস/ ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি / রঙ্গনা পাল পর্ব ১১


ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি
 রঙ্গনা পাল পর্ব-১১

   

       ঊননব্বই-এ ভর্তি হয়ে পি টি এসের তিনমাস পেরিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে ব্ল্যাক বেল্ট‌-এ প্রবেশ করে রাজন্যার কাজ হলো ওয়ার্ড-এ এসে রোগীর বিছানা করা, তাকে স্বাস্থবিধি সম্পর্কে সচেতন করা, প্রয়োজনে তাকে স্নানে সাহায্য করা এমনকি  যে রোগী খেতে না পারে তাকে খাইয়ে দেওয়া পর্যন্ত। এসব কাজ করতে খারাপ লাগছে না, যেকোন কাজ-ই ভালোবেসে করলে তার মধ্যে আলাদা একটা শান্তি থাকে। নিঃস্বার্থ সেবায় নিজেকে সমর্পণ করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি পায় রাজন্যা। আগেকার গর্হিত পরাধীন জীবনের কথা মনে পড়লেও ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিষ্ঠার সাথে রোগীদের সেবায় মনোনিবেশ করে। এও যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন কর্তব্য, নতুন জীবন। এখানে সেবার পরিবর্তে প্রীতি ভালোবাসা, স্নেহ পাওয়া যায় অযাচিত। এখানে যারা আসে তারা নিতান্তই নিরুপায় হয়ে আসে। সবাই ভালো থাকতে চায়। কিন্তু তবুও রোগ-জ্বালার প্রকোপে হাসপাতাল প্রায় ভরাট থাকে। 


    একশো তেরো নং বেডে মধ্যবয়ষ্ক এক ভদ্রলোক আমেরিকায় ছেলের কাছে থাকতেন। সম্প্রতি কলকাতায় এলেন তার ফ্লাটবাড়ি বিক্রয়ের জন্য। স্ত্রীর অনুরোধ রাখতে ফ্লাটবাড়িটা বিক্রি না করে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কাজ সেরে পুনরায় ফিরে যাওয়ার মুখে কোন কারণে ফুড পয়জন হয়ে একেবারে ডাইরিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়। এই সময় রাজন্যা ডিউটির বাইরে গিয়ে ভদ্রলোকের এতটা সেবা করেছে, নিজের স্ত্রী পর্যন্ত এতটা করতে পারেনি। হঠাৎ করে ভদ্রলোকের এতখানি অসুস্থতায় তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। গলা শুকিয়ে ভদ্রলোক এমন ভাবে জল, জঅল.... করছিলেন কিছুক্ষণের জন্য তার স্ত্রী ভাবলেন এই বুঝি শেষ জল চাওয়া। এই অবস্থা থেকে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে যেভাবে ভদ্রলোককে স্বাভাবিক জীবনের দিশা দেখিয়েছিলো রাজন্যা, খুব কম জন এভাবে পাশে থাকে। অনেকে কর্তব্য করে, রাজন্যা শুধু কর্তব্য নয়, একজন মা যেমন নিঃস্বার্থে তার সন্তানের সেবা করে তেমনভাবেই ভদ্রলোকের সেবা করেছিলেন। ভদ্রলোকের সস্নেহ 'মা' ডাক এখনো তার কানে বাজে। যাবার আগে তিনি বলেছিলেন-

      -তুমি চলো 'মা' আমার সাথে, আগের জন্মে নিশ্চয় তুমি আমার মেয়ে ছিলে।

      -কোথায় যাবো?

      -আমেরিকায়। আমার ছেলের সাথে তোমার বিয়ে দেবো।

       -তা হয় না। সবে আমার চলার পথ শুরু হয়েছে। এখন আমার যাবার উপায় নেই।

       -কেনো নেই? তোমার ইচ্ছে থাকলেই হলো।

      -আমি 'সেবা'র ব্রত নিয়েছি। আশীর্বাদ করুন, এই ব্রত নিয়েই যেন মরতে পারি...

     -এমন বলে না ..তবে তুমি তোমার কর্মে  নিশ্চয় যশোলাভ করবে 'মা'....

ভদ্রলোক চলে যাবার আগে রাজন্যা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শুনিয়েছিলো...


"সংসার যবে মন কেড়ে লয়, জাগে না যখন প্রাণ, 

তখনো, হে নাথ, প্রণমি তোমায় গাহি বসে তব গান। 

অন্তরযামী, ক্ষমো সে আমার  শূন্য মনের বৃথা উপহার.."


       সমস্ত ওয়ার্ড নিমেষের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ভদ্রলোক করুণ নয়নে চলে যাবার পর ওয়ার্ড-এর সবাই বলেছিলো, " সিস্টার আপনি অসাধারণ গাইলেন, কিছুক্ষণের জন্য আমরা সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে ছিলাম।" মাঝে মাঝে গান শোনানোর আবদারও রাখলেন। অনেকদিন পর গলা ছেড়ে গাইতে পেরে রাজন্যার মনেও পাথরচাপা দুঃখটা গলে গেল। তার জীবনে এতো বড় একটা প্রস্তাব এলো, সেই প্রস্তাবের প্রত্যাখান বুকে ব্যথা হয়ে বাজল। প্রস্তাব লোভনীয় হলেও সে আর এক পরাধীনতা। পরাধীনতার যন্ত্রণা ঠিক কতটা, এটা সে ভালমতো বোঝে। তাই আর স্বাধীনতা হস্তান্তরের কোন মানে হয় না। হ্যাঁ, ভদ্রলোক তাকে মায়ায় আছন্ন করে গেলেন, এটা ভুলতে সময় লাগবে। হাজার হোক সে তো মানুষ, অনুভূতিগুলো ভোঁতা নয়। সময়ের মলমে ভালোলাগার ক্ষতও বুজে যায় অনায়াসে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।


         হোস্টেলে নিজের রুমে ফিরে একটা আমন্ত্রণ পত্র পেলো। পাঠিয়েছে স্বাধীন। আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর "সুধাময়ীর নৃত্যসুধায়" নাটকটি এদিন মঞ্চস্থ হবে। এই স্বাধীনের ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কী চায় সে? কানাকানি শুনেছে নাটকের মেয়েদের নিয়ে তার আদিখ্যেতার কথা। দেখতে শুনতে মন্দ না, ভালো চাকরি করে। পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো। পাত্র হিসেবে মন্দ নয়, যেকোন মেয়ের বাবা হয়তো ধন্য হয়ে যাবে। রাজন্যা সেদিন কফিহাউস থেকে ফিরে স্বাধীনকে নিয়ে ভাবেনি এমন নয়, তবে স্থির সিদ্ধান্তেও আসতে পারেনি। বুঝতে পারছে না তাকে কতখানি বিশ্বাস করা যায়! কালো মেয়ে বলে নিজের গর্ভধারিণী যখন তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, ট্রেনিং-এ আসা ইস্তক একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। হয়তো ভেবেছে আপদ চুকেছে। তাহলে কার উপর বিশ্বাস করবে রাজন্যা ? বাবা অবশ্য সর্বসাকুল্যে দুবার এসেছেন। একবার ভর্তির দিনে এসেছেন নিতান্তই দায় সারতে, আর একবার কলকাতায় কাজে এসেছিলেন, ফেরার পথে জেনে গেছেন রাজন্যা খেয়েপরে বেঁচে আছে এখনও। ওই পর্যন্তই!! তাহলে?? স্বাধীন তো বাইরের লোক। তার মধ্যে কী এমন আছে যা দিয়ে নিজেকে স্বাধীনের সমকক্ষ ভাবা যায়! তাহলে কেন স্বাধীন তার সাথে আত্মীয়তা করতে চাইছে।  কিছু দূরভিসন্ধি ? নাকি স্বাধীন সত্যিই রাজন্যার প্রেমে পড়েছে? আরো কিছুদিন যাক্ না হয়, তাড়াহুড়োয় নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ