ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি/ রঙ্গনা পাল
স্বাধীনের ভয়কে মিথ্যে করে এ যাত্রা বেঁচে গেল রাজন্যা। পাক্কা আটাশ ঘণ্টা লড়াই-এর পর বেঁচে যাওয়ার আনন্দকে দমিয়ে রেখে কেমন অবসাদের দেওয়ালে চোখ খুলতেই ফাঁকা দেখে চারদিকটা। খুব আক্ষেপ হচ্ছিল কেন বেঁচে গেল! ভেতরের যন্ত্রণাটা একটা গভীর ক্ষত করে ফেলেছে, এ ক্ষত শুকোবার নয়। স্বাধীনের মুখটা বারবার ভেসে উঠতেই নিজের প্রতি ধিক্কারে বারবার চোখ বন্ধ করে ফেলছে সে। কিন্তু এ চোখ আর বন্ধ করে রাখার নয়, চোখ তো খোলা রাখতেই হবে। এবার রাজর্ষির জন্য মন খারাপ করছে। কাকে বলবে তার মনের কথা কেউ তো নেই। আচ্ছা স্বাধীন কি এসেছিল? নাকি রাতারাতি গা ঢাকা দিয়েছে? কেই বা তাকে এখানে নিয়ে এলো? প্রশ্নগুলো রীতিমতো তাকে উত্তেজিত করে ফেলছে। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে! এক অপরিচিত নার্স ছুটে এসে বলতে থাকলো -
-আপনি উত্তেজিত হবেন না প্লিজ
-আমার বাড়ির লোক কেউ এসেছে?
-আপনার স্বামী আছেন তবে এখানে নেই, আর অনুপম সেনগুপ্ত নামের কেউ আপনাকে এখানে ভর্তি করতে দেখে কাল থেকে অপেক্ষা করে করে একটু আগে বাড়ি গেছেন।
-ও, আচ্ছা। আপনাকে তো দেখিনি আগে?
-ম্যাম আমি আপনাকে চিনি। খুব বেশিদিন যদিও জয়েন করিনি। তবে আপনি খুব জোর বেঁচে গেছেন। কেন এমন করলেন?
-কে এনেছে এখানে?
-আপনার স্বামী।
-তা কোথায় তিনি?
-তিনি আপনার আচরণে এতটাই ভেঙে পড়েছেন, যে মানসিক ভারসাম্য রাখতে পারছেন না।
- নিজের মুখে একথা বলেছেন?
- অনেকেই দেখেছেন এই তো হাসপাতালের দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন, আর আপনার বেঁচে ওঠার প্রার্থনা করে যাচ্ছেন। শ্যামলীদিকে বলা হয়েছে আপনার স্বামীকে খবর দেওয়ার জন্য।
পুলিশ আসতেই স্বাধীনও এলো পিছু পিছু। রাজন্যার জ্ঞান ফিরতেই হাসপাতাল থেকে থানায় খবর দেওয়া হয়েছে। রাজন্যাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার আগেই, স্বাধীন বলে -
-স্যার আমি দোষী, আমাকে আ্যরেস্ট করুন।
কী ব্যাপার বলুন তো?
-আমি ওকে ভালো রাখতে পারিনি
-আপনি একটু চুপ করুন। আমি ওঁর থেকেই শুনতে চাই...
বলেই রাজন্যার দিকে নির্দেশ করলেন। রাজন্যার কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। মাথাটা কেমন ভার লাগছে। বিষণ্ণতা বাকি সব অনুভূতিগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত দিনের তিক্ত ঘটনাগুলোর ক্রম মনে ভাসছে অথচ মুখ দিয়ে একটা কথাও বলতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে পুলিশকর্তার দিকে। কে যেন মুখ চেপে ধরেছে। নাহ্ নানা প্রশ্ন করেও একটি কথাও বের করতে পারলেন না পুলিশকর্তা। এই সুযোগে স্বাধীন গল্প ফাঁদে-
-আমার বাড়ি ফিরতে দেরি হলেই রানি এমন করে। কিন্তু আমার কাজের বাইরেও একটা নাটকদল আছে। স্বাভাবিকভাবেই দেরি হয়ে যায়। মাথাটা খারাপ করে কেবল। মানসিক রোগীতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। উপস্থিত শ্যামলীদি বলেন, "হ্যাঁ, আজকাল রাজন্যাকে দেখে কেমন একটা লাগত যেন। কারো সাথে তেমন কথা বলে না, দেখেই মনে হত চাপে আছে"। ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছে অনুপম। একটু আগেই এসেছে সে। স্বাধীনের কথাগুলো শুনে মনে মনে বললো, "নাটক করার ভালো জায়গা পেয়েছো".,মুখে বললো- "তুই ওভাবে তখন পালাচ্ছিলি কেন? অনেক ডাকলাম শুনতে পেলি না"
-আর বলিস না, বাড়িতে খবর দেবার জন্য...
-তারপর সারাদিন তো খোঁজ নেই....
-হ্যাঁ, বাড়িতে মা অসুস্থ, বাবা বেরোতে পারেন না, ছোট ছেলেটাকে নিয়ে পাগল পাগল অবস্থা ----এর-ই মধ্যে ওকে কাজের মেয়েটির কাছে রেখে মন্দিরে গেছি আবার বাড়িতে মা'র কাছ থেকে রাত্রে আবার এখানে এসেছি।
পুলিশ কোনো কিনারা করতে না পেরে আবার আসবে বলে বেরিয়ে গেল। স্বাধীন অনুপমকে বলে, "একটু রানির কাছে থাক্ না ভাই, আমি বাড়ি হয়ে আসছি। এখন ছুটি দেবে না বলেছে, তাই পরে এসে ওকে বাড়ি নিয়ে যাবো।" অনুপম বলে, "আচ্ছা, তাড়াতাড়ি আসিস, আমিও বাড়ি যাবো। এখন যা হোক ভয় কেটে গেছে, আমি নিশ্চিন্ত"। স্বাধীন চলে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো। পরবর্তী ছক কষবে স্বাধীনের মা। মা বলেছে "বেঁচে গেলে পুনরায় মেরে ফেলার পরিকল্পনা করবে খুব সন্তর্পণে।" এবার রাজন্যাকে মা'র হাতেই তুলে দেবে বলে পণ করেছে স্বাধীন। খুব জোর বেঁচে গেছে, তার উপস্থিত বুদ্ধির জন্য। কাল থেকে দারুণ টেনশন নিয়ে এর ওর দরজায় ঘুরেছে, আজ অনেকটা স্বস্তি। নিজেই নিজেকে সাবাসি দিতে ভুললো না। কামিনীর মুখ মনে পড়ে গেলো। কামিনী এমনভাবে তাকে কামপাগল করেছে যে একটা রাত কামিনীর দেহের সুবাস না পেলে চলে না। এর মধ্যে কামিনী শর্ত রেখেছে বেঁচে গেলে ডিভোর্স চাই... কালকের রাতটা নিরামিষ কেটেছে। আজ সব উসুল করতে হবে। না পেলে জোর করবে। অতএব সটান কামিনীর দরজায় এসে দাঁড়ায় স্বাধীন। তার সাথে জরুরি কথা বলার আছে বলে শেষবারের মতো যশনগরের বাড়িতে টেনে এনে খিল তুলে দিল। অনেকেই ঘটনাটা দেখলো তবে স্বাধীনের টেনে আনার ধরণ দেখে তারা আন্দাজ করছে হয়তো একটা বোঝাপড়া করবে। স্বাধীনের আচরণ সত্যি তারিফযোগ্য! সে জানে আজকের পর এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। এমনিতেই কানাকানি হয়েছে প্রচুর। একের পর এক অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে চলেছে। এবার অন্য কোনো জায়গা খুঁজে নিতেই হবে। আপাতত শলাপরামর্শ পরে, আগে শরীরের খিদে মেটানো দরকার। কামিনীর রসালো শরীরে আঁচড় কাটা শুরু হয়ে গেছে। কামিনী জানে এই মুহূর্তকে থামানো অসম্ভব। স্বাধীন যেভাবে চায়, এখন তাকে সেভাবেই সহযোগিতা করতে হবে নইলে তাকে হাতে রাখা যাবে না। তাছাড়া সেও জানে কীভাবে স্বাধীনকে আঙুলের ইশারায় নাচাতে হয়!
- আহ্! আস্তে...কী শুরু করলে?
কামিনীর কথাটা গায়ে না মেখে সে আরো বেশি করে তাকে পেষণ, লেহন করতে থাকলো। গতদিনের সমস্ত অবসাদ ভুলতে স্বাধীন কামিনীর শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে নিংড়ে নিচ্ছে যৌনসুখ। মনে মনে নারকীয় উল্লাসে, পৌরুষত্বের প্রচণ্ড অহমিকায় ঢেলে দিচ্ছে আটাশ ঘণ্টার ক্লেদ। অন্যদিন কামিনী রোমে রোমে স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করে, আজ সুখের পরিবর্তে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, অপেক্ষা করছে স্বাধীন কতক্ষণে থামবে। আশ্চর্য! অন্যসময় একে অপরে বাক্ বিনিময়ে নিজেদের শারীরিক চাহিদা পূরণ করে, আজ যেন স্বার্থপর দৈত্য চেপেছে শরীরে।
অনুপমকে দেখে রাজন্যা এতক্ষণে কথা বলে-
-আপনি কীভাবে খবর পেলেন?
-তুমি সত্য বললে না কেন?
-বলতে পারলাম না।
-কেনো পারলে না? ওর শাস্তির প্রয়োজন। আর কতদিন?
-জানি না, তবে সব বলবো আপনাকে। যশনগরে থাকবো না আর, স্বাধীনের সাথেও নয়। একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিতে পারেন?
-আচ্ছা দেখবো, আগে সুস্থ হয়ে নাও। সাইক্রিয়াটিস্ট ডঃ ভৌমিকের সাথে একটা ডেট রাখছি। আমি তোমায় নিয়ে যাবো। তোমার কাউন্সিলিং দরকার। মন ঠিক না রাখলে বাঁচবে কীভাবে? বিশেষ করে ছেলেটার কথা ভাববে তো?
-এরপর আগামী সপ্তাহে..........
.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ