Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি/ রঙ্গনা পাল/পর্ব-৩৮


ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি / রঙ্গনা পাল


          রাত্রি নেমেছে অনেক আগেই। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে চারপাশ'টা। নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে কুন্তল। ফাগুনের শেষ। সকাল থেকে রোদের দাপট থাকলেও রাত্রে শীত শীত লাগছে। পাতলা একটা চাদর গায়ে  ঢেকেও স্বস্তি আসে না। কবর দেওয়া অতীত এখন গায়ের শিরশিরানি বাড়িয়ে দিয়েছে। একটু উষ্ণতার জন্য চোখ দুটো স্থির হয়ে, ফেলে আসা নিমেষগুলোকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। কখনও বা বারবার ফোনে সেভ করা নাম্বার'টাতে এসে থেমে যাচ্ছে চোখ দুটো। এতবার দেখেছে যে দশ ডিজিটের ওই নাম্বার'টা মুখস্থ হয়ে গেছে। চাইলেই ফোন করতে পারতো, হাজারও প্রশ্ন এসে ধাক্কা মেরেছে বুকে। এই ফোন নিয়ে কোন অশান্তি হবে না তো? হঠাৎ ফোন পেয়ে রাজন্যা বিপদে পড়বে না তো? ফোন করাকে কেন্দ্র করে কোনো অতীত খুঁড়ে ওর বাড়ির লোক আদিরস বের করবে না তো? রাজন্যা যদি খুশি না হয়? সে চেয়েছে বলে হয়তো ফোন নং দিয়েছে তা বলে কি ফোন করতে হবে? যদি কুন্তলের সাথে ফোনে কথা বলার ইচ্ছে থাকতো তাহলে রাজন্যা তার ফোন নং নিলো না কেন? অবাধ্য চোখগুলো বিদ্রোহ করেই চলেছে। ঘুমবাবাজিকে ফিরিয়ে দিয়ে সজাগ থাকার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


        রাত প্রায় দুটো। আটত্রিশের বসন্তবিলাপে শুধুই মনকেমনের ধুন। সবশেষে একাগ্রতার সঙ্গে মনকে বোঝায় রাজন্যা বিবাহিত। যদি সে সত্যিকারের ভালোবেসে থাকে, তাহলে দূর থেকেই না হয় তার জন্য  শুভকামনা সাথে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে। তবে হ্যাঁ, কাল সকালেই একবার ফোন করে নেবে। সে যদি চায় তাহলে কিছুসময় হাতে নিয়ে তার সাথে অবশ্যই দেখা করবে। যদি না চায়, এতে দুঃখিত হবে না বরং সকাল সকাল বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। মন একটু শান্ত হলে চোখের পাতা অর্ধেক আনত হয়েছে। ভোররাতে চোখ পুরোপুরি নিমীলিত হবার পর ঘুমিয়েছে। সকাল আট'টা নাগাদ ঘুম ভাঙে। চোখ জ্বালা করছে। চোখের পাতা ভারি লাগছে। পায়ের তলায় চার্জে রাখা ফোন থেকে চার্জারের প্লাগ সরিয়ে বিছানার মধ্যে বসেই রাজন্যার ফোনে রিং করলো। প্রথমবার, দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার ফোন বেজেই গেল। ওপার থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। কুন্তল ঠিক করলো আর রিং করবে না। রাজন্যা হয়তো ব্যস্ত আছে। ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠা রাজন্যার অভ্যেস কুন্তল এমনটাই জানতো বলেই  দ্বিতীয়বার না ভেবে রিং করলো। যাকগে একটা মায়া কাটাতে পারলেই খুব সহজেই এখান থেকে চলে যাওয়া সহজ হবে। দেরি না করে এবার তৈরি হয়ে নেবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে।


           কুন্তল বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে এমন সময় তার ফোনে রিং বেজে উঠলো। খুব দ্রুত মনের আকাশে আনন্দের রঙ ছড়িয়ে গেল। এ নিশ্চয় রাজন্যার ফোন। ধরতে দেরি হওয়ায় রিং থেমে গেল। সে কি আর একবার ব্যাক করবে নাকি অপেক্ষা করবে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। আবার রিং হতেই ফোন'টা না দেখেই গলায় উচ্ছ্বাস রেখে বললো-

            -হ্যালো...

            -হ্যালো দাদা, এই নাম্বার'টা পাশের বাড়ির ছন্দাদির....

মুহূর্তেই গলায় খানিক'টা বিষাদ জড়িয়ে গেল অজান্তেই। বিষণ্ণতাকে চাপা দিয়ে কুন্তল বলে-

           -হ্যাঁ, বল...অন্যের নাম্বার থেকে ফোন করছিস যে-

           -প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছি রে দাদা। তোকে ফোন করতে গিয়েই ফোন'টা হাত থেকে পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। আর সুইচ অন করতে পারছি না।

             -কী হয়েছে বলতো?

             -কাল রাত্রি থেকে লিমার জ্বর মাত্রা ছাড়িয়েছে। ভোর রাতে থেকে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মাথা থেকে আগুন বেরোচ্ছে। দু'বার আ্যাডমল দিয়েছি, জলপট্টি দিয়ে চলেছি। শেষে মাথা ধুইয়ে দিলাম তবু কমছে না রে ....

লিমা কুন্তলের ভাগ্নি। কুন্তল তাকে খুব ভালোবাসে। তড়িৎ গতিতে সে বলে -

               -সে কী! আগে জানাসনি কেন? আচ্ছা আমি এখনি বেরোচ্ছি।


           কুন্তল ফ্রেশ হবার জন্য বেরিয়ে গেলে তার ফোন বাজতেই থাকলো। একবার, দু'বার, তিনবার...নাহ্ কুন্তল ফোন তোলার জন্য আর এলো না। রাজন্যা উদ্যম হারিয়ে ফেললো। কে ফোন করেছিল তাকে? স্নান সেরে ঠাকুরকে ফুল জল দিচ্ছিল। সেইসময় তিনবার ফোন'টা বেজেছে। সাইলেন্ট ছিলো বলে বুঝতে পারেনি। হায়! কুন্তলদা নয় তো? নয় বোধহয়! সে করে থাকলে ধরছে না কেন? আধঘণ্টা পার হয়েছে মাত্র। কাল থেকেই কুন্তলদার ফোন'টা ভীষণভাবে আশা করেছিল। তার পোড়া কপালের দোষ! কোন ভালো কিছু বা অভিপ্রেত কিছু তার জন্য নয়। রাজন্যা মনে মনে ভাবলো, "কী আর করা যাবে। ফোনটা যেই করে থাকুক আবার করবে নিশ্চয়।" কাজের মেয়ে রেণুকাকে পেয়ে একটা ভালো কাজ হয়েছে। দুশ্চিন্তা কমেছে। ছেলেটাকে দেখেশুনে রাখতে পারবে। আজ বরং একবার হাসপাতালে যাবে। সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে ছেলের স্কুলের ব্যাপার'টা ফাইনাল করে নেবে। সবকিছু গুছিয়ে নিলে মন দিয়ে চাকরি'টা করতে পারবে। স্বাধীনের দিক থেকে আর কোন খবর নেই। মাঝে মাঝে মন'টা ছটপট করলেও এবার নিজে থেকে আর কোন খবর নেবে না বলেই ঠিক করেছে।


               কোনোরকম চা'টা পান করেই বেরিয়ে পড়লো কুন্তল। বেরিয়ে পড়ার খবর'টা দিতে ছন্দাদির নাম্বার খুঁজতে গিয়ে দেখে রাজন্যার তিন তিনটে কল সে মিস করেছে। খুব ইচ্ছে করছিল একবার ফোন'টা করে বলে, "আমিই তোমায় ফোন করেছিলাম"। নাহ্ দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে ভাগ্নির জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। এখন বরং থাক্। নাম্বার তো থাকছে, পরে না হয় ফোন করে নেবে। তার নিজের মনকে প্রশ্রয় দেবার মতো আর কোন পরিসর নেই। 


             -এরপর আগামী সপ্তাহে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ