ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি
ভালোমন্দের চিরুনিতে মাথা আঁচড়ে বেশ কাটছে রাজন্যার। গ্রামের জন্য মাঝেমাঝেই মন কেমন করে । হঠাৎ সুযোগ হয়ে গেলো তাই দুদিনের ছুটিতে বাড়ি এসে প্রথমেই দাঁড়ালো দক্ষিণের জানালাটায়। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলো, মনের সহস্র বাহু বিস্তার করে ছুঁয়ে ফেললো শারদ আকাশ। নাহ্ রোদ ঝলমলে দিন নয়; হয়তো গণেশ চতুর্থীতে পথঘাট ধুয়ে দেবার জন্য বৃষ্টিরানির তৎপরতা একটু বেশি, তাই শরতেও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। তাছাড়া এখন আবার মেঘেদের মান অভিমান মিটছেই না। ফলে যখন তখন ঝরে পড়ছে অনিয়মেই। সত্যি তো! মানুষের মান অভিমান হবে মেঘেদের হতে নেই? তবু মেঘে মেঘে পেঁজা তুলো ভিজে চুপসে যাচ্ছে না বরং আগমনির সুর অনুরণিত আকাশে বাতাসে। দূরে কাশ দুলছে বাতাসে, সামনের পুকুরটায় হাসছে পদ্মকোরক, হাঁসগুলো জলকেলিতে মত্ত। শিউলির সাজানো পথে শিশিরের কথাকলিতে মজে আছে প্রকৃতি।
বেশ কিছু সময় বাড়িতে এসেছে রাজন্যা, দরজাটা খুলে মা-ই ভেতরে আসার পথ করে দিল, ব্যাস! ওই পর্যন্তই! অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়, বরাবর হয়ে আসছে। তবু বৃথা আশা শারীরিক কুশল না হোক সামান্য জলটুকুও এগিয়ে দেবে, প্রতিবারই আশাহত হয় তবু মন শক্ত করতে পারেনি। বাবা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাটুকু ছাড়া বাড়তি খবর নেবার তাগিদ রাখেন না আজও। একটু আগের মন ভালো করা পরিবেশে এখন বিষণ্ণতার করুণ আস্তরণে সীমায়িত। দক্ষিণের জানালা পেরিয়ে সে কোনরকমে বরাদ্দ স্টোররুমের বন্ধ ঘরটা খুলতেই কেমন একটা গুমোট গন্ধ নাকে লাগলো। এমনিতেই ঘরে আলো বাতাস আসা যাওয়া করে না, তার উপর দীর্ঘসময় বন্ধ থাকায় কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বই-এর টেবিলে ধুলো জমেছে। তক্তার উপর স্থান করে নিয়েছে বাতিল হওয়া জিনিসপত্র কাপড় জামার স্তুপ। তক্তার উপরের জিনিসগুলো তক্তার তলায় ভরতে গিয়ে দেখে খুব বেশি জায়গা খালি নেই। তবু তারমধ্যেই জিনিসগুলোকে কোনরকম গুঁজে দিয়ে ঘরটা পরিস্কার করার পর খানিক স্বস্তির শ্বাস নিল।
মন্দের ভালো এখন ঘরে কাজের লোক রাখা হয়েছে। আগের মতো ঘরের কাজ না করলে বা মায়ের কথার অন্যথা করলে বা জিনিস নষ্ট করলে যেমন খাওয়া জুটতো না, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, চোখের জল ভাতে মেখে খেতে হতো; সেই বিগত দুর্দিনের পুনরাবৃত্তি না হলেও চরম উপেক্ষার নমুনা রাজন্যা প্রতিনিয়ত পাচ্ছে। দিন বদলাচ্ছে, হয়তো ভাগ্যও বদলাবে, অপেক্ষা কেবল সময়ের। হঠাৎ বাড়ি আসার খবরে স্বাধীন অনুরোধ করেছে তাদের বাড়ি আসার, স্বাধীনের মা বলেছে, এবার যদি রাজন্যা তাদের বাড়ি না আসে, তাহলে তারা মা ছেলেই আসবে রাজন্যার বাড়িতে। খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে রাজন্যা স্বাধীনের বাড়ি আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুপুরের খাবার ওখানেই খাবে। রাজন্যা এখনও স্বাধীনের ব্যাপারটা বাড়িতে জানায়নি। জানলে কী প্রতিক্রিয়া হবে বাড়ির লোকজনের আন্দাজ করতে পারছে না। এখন জানাবেও না। ট্রেনিং শেষ হলে যতদিন চাকরি না পাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত জানাবে না।তারপর বাড়িতে মানুক, না মানুক আর কিছু যায় আসবে না।
থাকার জায়গাটা ঠিকঠাক করে ঝটপট স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিল রাজন্যা, তিনমাথার মোড়ে অপেক্ষায় রয়েছে স্বাধীন। রেডি হয়ে বাইরে বেরোবার মুখে মা'র পিছুডাক-
-কী রে এখন বেরোচ্ছিস যে-
-হ্যাঁ, কাজ আছে একটু।
-তা, দুপুরে খাবি তো নাকি?
-না, ফিরতে বিকেল হতে পারে।
-খাবি কোথায়?
-সে বাইরেই খেয়ে নেবো।
- তাহলে বললি না কেন? ভাত চাপানো হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই..
-ওগুলো রাত্রে খেয়ে নেবো।
- সামান্য ট্রেনিং-এ গিয়েই তো দেখছি ঠাটবাট বদলে ফেলেছিস, কাজটাজ পেলে আমাদের মাথাগুলো কিনে নিবি দেখছি।
-সেই সাতসকালে এসেছি, সামান্য জলখাবারটুকুও জোটেনি, ভাবছিলাম দুপুরেই বা জুটবে কী না! তাছাড়া আমার কাজ আছে, নয়তো না খেয়েও থাকার অভ্যাস আছে আমার।
- বাবারে! এ নাকি আমার মেয়ে! মুখ তো নয় যেন কথা বলার মেশিন...
-আসি এখন তা না হলে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
-আসুন মহারানি...উদ্ধার করুন...
মায়ের কটাক্ষ গা থেকে ঝেড়ে ফেলে বেরিয়ে এলো রাজন্যা।
উফ্! আনন্দ আর ধরে না; ওই দূরে দেখা যাচ্ছে রাজন্যা হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে। বাইক থেকে নেমে ঋজু হয়ে দাঁড়ালো স্বাধীন। অবশেষে তাকে ধরা দিতে আছে রাজন্যা। এই মুহূর্তটাকে সে তার মন ক্যামেরায় বন্দি করে নিচ্ছে সযত্নে। এইবার ধীরে ধীরে তার সমস্ত অপমানের, উপেক্ষার সর্বোপরি রাজন্যার ফালতু আত্মকেন্দ্রিকতার একটা আপাতসুন্দর প্রত্যুত্তর দিতে পারবে। ওহ্ হ্যাঁ, সে আশা করছে তার মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারলেই সম্বন্ধ পাকা হওয়ার নিশ্চিত ছাড়পত্র পেয়ে যাবে। কিছুটা সময়ের মধ্যে রাজন্যা স্বাধীনের কাছাকাছি চলে আসায়, ভাবনাকে খুব বেশি আন্দোলিত করতে পারলো না স্বাধীন। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে সে বললো-
-তুমি এলে, আমি ভীষণ খুশি হলাম।
-ধন্যবাদ। তবে সামান্য দূরত্বের জন্য বাইক নিয়ে এলে কেন?
- তোমাকে স্বাগত জানাতে, বলতে পারো তোমার খাতিরদারি করতে...
-কোন প্রয়োজন ছিল না।
-এখনও তুমি আদ্যিকালের বদ্যিবুড়িদের মতো কথা বলবে?
- তা কেন? বলেই হেসে ফেলল রাজন্যা।
-নাও ওঠো গো রানি..
- রানি?
-হ্যাঁ আমার রাধারানি..
-যাহ্...কী যে বলো...এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি..
-হোক্..আমার রানির জন্য আমি সামান্য বাড়াবাড়ি করলাম না হয়।
কে কোথায় দেখে ফেলবে, আবার বাড়িতে খবর দেবে, এটা ভেবে আর বেশি কথা না বলে স্বাধীনের বাইকে ওঠে পড়লো রাজন্যা।
-এরপর আগামী সপ্তাহে......
.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ