Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি/রঙ্গনা পাল : পর্ব-১৯



ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি/রঙ্গনা পাল : পর্ব-১৯

          সালটা উনিশশো বিরানব্বই।‌ এর কিছু বছর আগেও নগরায়নের উচ্চাভিলাষে মানুষ তেমনভাবে মজেনি। মন মানসিকতার আবহাওয়া ততটা দূষিত হয়নি, ছেলেমেয়েদের শৈশব, কৈশোর, যৌবনের ধাপগুলো বেশ উপভোগ্য ছিলো। জটিলতার অক্টোপাসে নিজেদের নিমজ্জিত করার ঝোঁক ছিলো না। তখনও সারল্য বেঁচে ছিলো বহাল তবিয়তে। পরিবার পিছু একটা করেই মন্থরা ছিলো। এখন যেমন পরিবারে ভালোমানুষের সংখ্যা এক-আধেক, মন্থরাদেরই রাজত্ব। রাজন্যার পরিবারে প্রায় সবাই মন্থরা। স্বাধীন জানিয়েছে রাজন্যার মা স্বাধীনের সাথে রাজন্যার বোন অনন্যার বিয়ে দিয়ে চেয়েছেন। বড় মেয়েকে বাদ দিয়ে ছোট মেয়েকে পাত্রস্থ করতে চেয়েছেন তার সাথেই যার নাকি চরিত্রের কোন ঠিক নেই, যাকে নাকি গোটা পাড়ার লোক ছিঃ ছিঃ করে! নিঃসন্দেহে তার বোন তার চেয়ে সুন্দরী, বয়সের ব্যবধান অতিরিক্ত নয় সামান্য তাই বলে রাজন্যার ঠিক করা পাত্রের সাথে বোনের বিয়ের সম্বন্ধ পাকা করার প্রস্তাব মানতে পারছে না কিছুতেই। রাজন্যার বোন অনন্যার কলকাতায় পড়ানোর খরচ চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে স্বাধীন। সেইসঙ্গে গোটা পরিবারের মাথা হবার অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করেছে। এ সমস্ত কিছু শোনার পর কোন মেয়ে স্বাধীনের মতো ছেলেকে মন থেকে গ্রহণ না করে পারে?


         খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হলো না, মাত্র তিনমাসের ব্যবধানেই সুদূর মুর্শিদাবাদের তেঘরিয়া ব্লকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্সের চাকরিটা পেয়ে গেল রাজন্যা। জায়গাটা একেবারেই বাংলাদেশ বর্ডারে। স্বাধীন এখানে রাজন্যাকে চাকরি করতে বাধা দিল। ও একা এতদূরে চাকরি করবে, ওর নিরাপত্তা কোথায়! চাকরি পাওয়ার আনন্দটা প্রায় মাটি হতে বসেছে জায়গাটার জন্য। বর্তমান দীর্ঘসূত্রিতার অবসান ঘটল রাজন্যার চারিত্রিক দৃঢ়তায়। অন্যের গলগ্রহ থাকার চাইতে ঢের ভালো প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। সামনে এগোনোর রাস্তা কঠিন হতে পারে অসম্ভব নয়। অতএব ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর জন্য গোছগাছ শুরু হয়ে গেল। আগামী ১৮ই মে'তে জয়েনিং। নির্দিষ্ট দিনে সমস্ত বাধাকে নস্যাৎ করে স্বাধীনকে আস্বস্ত করে, তাকে সাথে নিয়ে চাকরিস্থলে হাজির হলো রাজন্যা। জায়গাটা বুনো বুনো। গাছপালাকে ভালোবেসে বড় হয়েছে সে কিন্তু এখানের গাছের ঘনত্বে কেমন একটা গা ছমছম ভাব। জায়গাটা ঘুরে দেখে ভালো লাগলো বটে, তবে একাকিত্ব বাড়তে লাগলো। স্বাধীন তো আর কিছুক্ষণ মাত্র, কোয়াটারটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে খানিকটা দূরে, ঘন জঙ্গলের সুনিবিড়ত্বে।


     জয়েন করার সময় দারুণভাবে আপ্যায়ন পেল রাজন্যা। এখানকার লোকজনেরাও বেশ আলাপী, কেবল ভাষাটা একটু খটমট, ধীরে ধীরে নিশ্চয় আত্মস্থ হয়ে যাবে। চাকরিটা তার কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ। পরিবেশ নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যকর। কেউ পরিচিত থাকলে বা ভাষাটা জানা থাকলে না হয় আত্মীয়তা বাড়ানোর একটা সুযোগ পাওয়া যেত। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মায়নি, ছোটবেলা থেকে অস্তিত্বের জন্য লড়াই করেছে এখন না হয় আগামীতে টিকে থাকার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে। তাছাড়া সেবা করার প্রবৃত্তি নিয়ে এসেছে, সেটাই না হয় নিষ্ঠার সাথে করে যাবে; সফলতা আসবেই। নিজেকে কিছুতেই ভাঙতে দিল না। জয়েনিং-এর পর তার জন্য বরাদ্দ কোয়াটারের মধ্যে জিনিসপত্র রেখে স্বাধীনকে নিয়ে কোয়াটারের বাইরে বেরিয়ে এল। স্বাধীনের ফিরে যাবার সময় এগিয়ে এল; মনটা ভারি হয়ে এসেছে। বনবীথি পেরিয়ে মেইন গেটের মুখে এসে সামান্য দাঁড়িয়ে রাজন্যার হাতদুটো ধরে স্বাধীন বলে-

        - এমন পরিবেশে তোমাকে একা ছেড়ে যেতে মন চায় না।

           -চিন্তা করো না আমার অসুবিধে হবে না।

         -আমার অসুবিধে হচ্ছে। কী দরকার ছিলো বলো তো?

         - আমায় দুর্বল করে দিয়ো না-

         -ঠিক আছে, আমি আর কিছু বলবো না, কথা দাও রোজ চিঠি লিখবে

          -লিখবো, তবে রোজ পারবো কি না জানি না।কাজের চাপ বুঝি তারপর...

          -তাহলে মাঝে মাঝেই লিখো না হয়..

          -এবার তুমি এসো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।

         -হ্যাঁ, যাবার আগে তোমার থেকে যদি কিছু চাই দেবে?

কী আবার চাইবে, কী দিতে পারে সে ভেবেই চলেছে, এ আবার কোন দুষ্টুমি করবে না তো? বিয়ের আগে কোন অবাধ্যতা বরদাস্ত করা যাবে না। এদিকে দেরি হচ্ছে আবার স্বাধীনের কথাটাও ফেলতে পারছে না‌‌। আচ্ছা দেখা যাক্ তার চাওয়ার পরিধি কতটা-সে বলে..

         -চেষ্টা করবো। বলো কী চাও?

         -আগে কথা দাও‌।

         -আরে বলোই না..

          -একটা গান শোনাবে?

রাজন্যা সোৎসাহে শুরু করে....

 " ভরা থাক্‌ স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি।

মিলনের উৎসবে তায় ফিরায়ে দিয়ো আনি

বিষাদের অশ্রুজলে নীরবের মর্মতলে

গোপনে উঠুক ফলে হৃদয়ের নূতন বাণী

যে পথে যেতে হবে সে পথে তুমি একা-----"


       গান শুনে আশেপাশে যারা ছিলো সকলে জুটে গেলো তড়িৎ বেগে। স্বাধীন আলাদা করে রাজন্যার সাথে কথা বলার সুযোগ পেলো না আর, অগত্যা গানের শেষে প্রশংসাস্তুতি করে তখনকার মতো সেখান থেকে বিদায় নিলো । উপস্থিত সকলে রাজন্যার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ। প্রথমদিনেই সে যে এভাবে সকলের প্রীতিভাজন হয়ে উঠতে পারে, ধারণা ছিলো না। একাকিত্ব কিছুটা কমবে মনে হচ্ছে। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কাজটা শুরু হয়ে গেছে। স্বাধীন চলে যাবার পর ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। যাবার আগে রীতিমতো টেনশনে ফেলে দিয়েছিলো‌। তবে তার চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে গান শোনাল বটে তবে অজান্তেই তার নিজের অনেকটা ভার মুক্তি ঘটে গেছে। রবি ঠাকুরের গান সমস্ত ক্লান্তি লাঘবের চাবিকাঠি। আজকের দিনটা ঘুরে ফিরে হালকা কাজে কেটে গেলো। আগামী কাল থেকে আলাদা দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে হচ্ছে। বেলা ডুবতেই লাফিয়ে অন্ধকার নেমে এলো। ভয়টাও প্রকট হচ্ছে ক্রমে। এই জঙ্গল ঘন বনের নিস্তব্ধতায় শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম, বাড়ছে উদ্বেগ। রাত নামার সাথে শব্দের কনসার্ট শুরু হয়ে গেল। এতরকম শব্দ কিসের! এবার গরুর খুরের মতো অনেকগুলো আজয়াজে রীতিমতো অস্থিরতা এসে গেলো রাজন্যার।এবার কী হবে?



            -------এরপর আগামী সপ্তাহে...

          

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ