ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি, পর্ব-২১
কামাল যে কদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছিল, রাজন্যাকে ভরসা করে শুনিয়েছিল তার জীবনে ঘটে যাওয়া কাহিনি। শুনিয়েছিল তার অপরাধী হওয়ার নেপথ্য কথা। সাফিয়াকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে সাদি করার পর আর্থিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল। কোথাও কাজ পাচ্ছিল না, দুজনের বাড়ির লোক-ই ওদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো। সাফিয়া কামালকে পেয়ে সুখী হয়েছিল। তবে দিন যত এগোতে লাগলো ওদের সংসারে অভাব প্রকট হতে থাকল। জমানো কিছু টাকা আর কতদিন চলে? সাফিয়া এক সালোয়ারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। টিউশন পড়ানো শুরু করলো কামাল । জমলো না। বাড়িভাড়ার টাকাটাও জোটানো দায় হয়ে পড়ছিল। এসময় স্কুলজীবনের দোস্ত মাহবুবের সাথে মুলাকাত হলো। মারকুটে মাহবুবের বর্তমান চেহরা দেখে তাজ্জব কামাল। একনজরে চিনতেও পারেনি। মাহবুব আগে থেকে এজাহার না দিলে হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে যেত কামাল।
দোস্তকে পেয়ে বহত খুশ হলো কামাল। যেন চাঁদের মতো রোটি পেল । পুরানো কথা না শুনে প্রথমেই বলে ফেলল- "তোর নবাবি সাজের হালচাল দেখে তোকে লাখপতি মনে হচ্ছে তুই আমায় একটা কাজের সন্ধান দে না ভাই, বড় অসুবিধায় পড়েছি।"
-বলিস কী আমি লাখপতি হলাম কবে?
-ভাই আমার কাজের দরকার -
কি ব্যাপার বল তো?
-ভাই, পারবি একটা কাজের আরমান পুরা করতে?
-খুলে বল তো এমন হালাত কেন?
-সব বলবো এখন একটা কাজের হদিস দে-
-আছে একটা কাজ, তুই কি পারবি?
-যেকোন কাজ করতে রাজি, বল কী করতে হবে..
-তুই পারবি না, তোকে তো চিনি। ভীষণ ভদ্র ছেলে তুই , তোর দ্বারা...
-বল না কী এমন কাজ, সেটা আমি পারবো না!
- এসব কাজের জন্য আগে থেকে হাত পাকাতে হয়, তোর তেমন অভিজ্ঞতা নেই..
-সব পারবো, বলে দেখ-
-বাংলাদেশ বর্ডারে মাল পাচার করতে পারবি?
কিছুক্ষণের জন্য নাড়ির স্পন্দন থেমে গেল কামালের। না, নাহ্ না খেতে পেয়ে মরে যাবে তবু এ কাজ করতে পারবে না। মাথা নিচু করে কোন উত্তর না দিয়ে চলে যাচ্ছিল কামাল। মাহবুব বলে-
"আমি জানতাম তুই পারবি না.."
যথারীতি সে মাথা না তুলেই নিঃশব্দে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই আবারও বলল মাহবুব -
-"কেন জানি না মনে হচ্ছে তোর কাজটার দরকার, জানি এটা তোর সাথে যায় না তবু দোস্তির খাতিরে বলেছি, যদি কোনদিন রাজি থাকিস তাহলে আসিস আমার কাছে। এই নে আমার ঠিকানা (বলে একটা কার্ড এগিয়ে দেয়) তুই তো জানিস ছোটবেলা থেকেই আমি মস্তান। তাই সৎ কাজ দেবার ক্ষমতা নেই রে। তবু তোর দুঃসময়ে তোকে সাহায্য করতে পারলে ভালো লাগবে"
কোন দোষ না করেও মাহবুবের কাছ থেকে চোরের মতো পালিয়ে এসেছিল কামাল। সাফিয়াকে কিচ্ছুটি জানাতে পারেনি। সাফিয়া মা হতে চলেছে। ওর পুষ্টির দরকার। পর্যাপ্ত খানার প্রয়োজন। ওষুধ পথ্যিও লাগবে। ওর চেহারা ভেঙে যাচ্ছে। দুটো দিন হাঁড়ি চড়েনি। উঠোনে মাথা ঘুরে পড়ে গেল সাফিয়া। একটা ইটের টুকরোয় খানিকটা ছড়ে গেল। টিউশন থেকে বাড়ি ফিরে সাফিয়ার তবিয়তের হাল দেখে চোখে পানি এসে যায় কামালের। বাধ্য হয় মাহবুবের সাথে দেখা করতে। রাজন্যা এবার কামালকে থামিয়ে দেয়। বলে, "আমি জানি কামাল দা, তুমি খুব ভালো মানুষ" আজ আরেকবার কামালের চোখে পানি এলো রাজন্যার মুখে ভালো মানুষ কথাটি শুনে। মনে ভেসে উঠল সাফিয়ার মুখ। অনেক কষ্ট সহ্য করেছে সাফিয়া। প্রথম যেদিন রাত্রে বাড়ি ফেরেনি সেদিন সাফিয়া সারারাত জেগে কাটিয়েছিল। তারপর সাফিয়ার হাতে নোটের বান্ডিল দিয়ে কামাল বলেছিল -"বাইরে কাজ পেয়েছি, টাকাটা আ্যাডভান্স নিয়েছি। তুমি কটাদিন চালিয়ে নিও। সাবধানে থেকো"। তার লেড়কার জন্মের সময়ও থাকতে পারেনি। টাকা এসেছে কিন্তু সুখ শান্তি সংসার হারিয়ে গেছে কামালের জীবন থেকে।
রাজন্যার এও এক অভিজ্ঞতা!জীবনে চলার পথে তার অতীত দুঃখগুলো বড় কম মনে হয়। বর্তমানে সেবা করার সে যে অঙ্গীকার করেছে তাকে সর্বদা মান্যতা দেবার চেষ্টা করছে আপ্রাণ। এবার হয়তো আর একা থাকতে পারবে না সে। স্বাধীনের মা ভীষণ তাড়া দিচ্ছেন। তিনি আর অপেক্ষা করতে পারছেন না। এবার ঘরে লক্ষ্মী আনবেন মনস্থ করেছেন। রাজন্যার এতে বিশেষ আপত্তি নেই। শুভ দিনে সানাই বাজলো বলে। বলে নাকি বিয়ের জল গায়ে লাগলে পাত্রী সুন্দরী হয়ে ওঠে। রাজন্যা দেখতে পাচ্ছে না কতখানি সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে তার দেহবল্লরীতে তবে ভেতরে ভেতরে যে একটা শিহরন হচ্ছে এটা উপলব্ধি করেই লজ্জায় মুখ ঢেকে নিজের অজান্তেই।
-এবার আগামী সপ্তাহে.....
.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ