Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি / রঙ্গনা পাল /পর্ব-৩৫



র বেঁধেছে ঝড়ের পাখি / রঙ্গনা পাল


       কামিনী থেমে থাকেনি। রাত পোহালেই নিজের গায়ের ঝাল মেটাবার জন্য সাতসকালে এসে পৌঁছেছে স্বাধীনের বাড়ি। এসেই চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। রাজন্যা তখন বাড়িতেই ছিল। ঘরে বউ রেখে দিনের পর দিন তার উপর শারীরিক অত্যাচারের জবাবদিহি করতে হবে এমনই তার দাবি। চিৎকার শুনে প্রত্যেকেই একজায়গায় সমবেত হলো। এ বাড়িতে স্বাধীনের মা'র মুখের উপর কথা বলার সাহস নেই কারও। সকলেই অপেক্ষা করতে লাগলো। বেরিয়ে এলো রাজন্যাও। রাজন্যাকে দেখে কামিনী আহত সাপের মত ফুঁসে উঠছে। স্বাধীন চেষ্টা করলো কামিনীকে শান্ত করার। ফল হলো উল্টো। কামিনী সজোর ধাক্কায় সরিয়ে দিল তাকে। এবার রাজন্যা বলে-

       -ওঁকে ধাক্কা মারার সাহস পাও কীভাবে?

        -এতদিনেও বোঝনি? কচি খুকি...

        -মুখ সামলে কথা বলো-

       -তোর মুখ আছে আমার সাথে কথা বলার? কী দিতে পেরেছিস নিজের স্বামীকে? কেন আসে আমার কাছে? আটকাতে পেরেছিস? কী আছে তোর? চাকরির গরম দেখাচ্ছিস? ওমন চাকরির মুখে আগুন...

কামিনী তাকে তুই তোকারি করে কথা বলছে, সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে। আর যার হয়ে কথা বলার জন্য এসব শুনতে হচ্ছে সেই স্বাধীন রঙ তামাসা দেখছে! মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সামনের দেওয়ালটা ধরে নিজেকে সামলে নিলো সে। কামিনী কালকে কীভাবে স্বাধীনকে অপদস্থ করেছে তার পুনরাবৃত্তি করলো। লজ্জায় ঘৃণায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে রাজন্যার। গা গোলাচ্ছে। হাত পা টলটল করছে। হঠাৎ এমন অসুস্থ লাগছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না। কামিনীর হাত ধরে এবার স্বাধীনের মা তাকে নিজের ঘরে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলো।


       স্বাধীন আস্বস্ত হলো। মা নিশ্চয় পরিস্থিতি ঠিক করে দেবে। উফ্ এতক্ষণে হালকা লাগছে। দুটো দিনের ঝড় সামলানো  বেশ কঠিন। রাজন্যার প্রতি না হয় সব কর্তব্য শেষ হয়ে গেছে। ওর কোন কিছুতেই তার কিছু এসে যায় না। একবার ডিভোর্সটা ভালোয় ভালোয় পেয়ে গেলে হয়। এই সংসার তার জন্য নয়। ছেলেপুলে নয়, বাবা ডাক নয় একটা ডবকা শরীর হলেই হবে। এর চেয়ে বেশি কোন চাহিদা নেই। হ্যাঁ , হ্যাঁ -নারী শরীর না পেলে সে হয়তো মৃত্যুর পথ বেছে নিতে পছন্দ করবে। অনেক নারীর শরীর ভোগ করেছে, কামিনীর মতো করে কেউ তার চাহিদা মেটাতে পারেনি। তাই যেভাবেই হোক কামিনীকে তার চাই-ই-চাই। মা কি বুঝেছে তার যন্ত্রণাটা? পুরোটা বলার আগেই তো কামিনী এখানে হানা দিয়েছে। ঘটনাটা জানা থাকলে হয়তো মা অনেক আগেই ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে পারতো! এদিকে ঘরের মধ্যে এনেও কামিনীকে ঠান্ডা করা যাচ্ছে না। কোন কথা শুনছে না। মোদ্দা কথা রাজন্যার এখানে থাকাটা সে মেনে নিচ্ছে না। তাকে কিছুতেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না- প্রতিদিন রাজন্যাকে খাবারের সাথে বিষ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ধীরে ধীরে ওর সমস্ত চিন্তা চেতনা লোপ পায়, ভালোমন্দের বোধ হারিয়ে যায়, ওর উন্নত মাথাটা যাতে চিরদিনের মত খর্ব হয়ে যায়। উপর থেকে একজন সব লক্ষ্য রাখছেন না হলে আজকের উটকো ঝামেলায় এভাবে মা ছেলে নাকাল হতো না।


     উষ্ণ পরিবেশে শীতল হাওয়ার মতো ছোট্ট রাজর্ষি তার মা'কে জড়িয়ে ধরে বলে-

           -ও, মা চলো না এখান থেকে চলে যাই। এখানে আর থাকবো না। এখানে সবাই পচা..

          -চলে যাব বাবা, আর কটাদিন পর..

          -না, মা আজ-ই চলো। এখানে তোমাকে কেউ ভালোবাসে না।

 পায়ে পায়ে শ্বশুর মশাই এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন-

            - দাদাই ঠিক বলেছে বৌমা। তুমি চলে যাও এখান থেকে..নইলে ওরা তোমায় বাঁচতে দেবে না...

             -কী বলছেন বাবা? মা তো এখন আমাদের খেয়াল রাখেন।

            -এখন ধারে কাছে তোমার শাশুড়িমা নেই তাই তোমার সাথে দুটো কথা বলছি। কেউ দেখে ফেললেও বিপদ।

            -আমি খুব অসুস্থ বোধ করছি। কটাদিন পরে যাই?

             -এটাই সুযোগ চলে যাও...তুমি অসুস্থ বোধ করছো না, তোমাকে অসুস্থ করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে...আমার প্রতিবাদ করার উপায় নেই বউমা....

          -এমন করে কেন বলছেন বাবা? 

          -ঠিক বলছি। দাদুভাই-এর মুখের দিকে তাকাতে পারি না। তুমি ডিউটিতে চলে যাবার পর ও অনাথ হয়ে যায়। চলে যাও এখান থেকে ...চলে যাও যত তাড়াতাড়ি পারো......

কথাকটা বলে স্বরাজবাবু দ্রুত চলে গেলেন নিজের ঘরে। রাজন্যা এবার রাজর্ষিকে জড়িয়ে ধরে বললো- "আমরা আজ-ই এখান থেকে চলে যাবো বাবা।" রাজর্ষিকে বললো ঠিক-ই কিন্তু স্বাধীনের এরকম একটা বিপদে তার চলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? সে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা নাই দিক, তাই বলে স্বামীর ক্ষতি হোক এটাও মন থেকে মেনে নিতে পারছে না। মানসিক দ্বন্দ্ব কাটতে না কাটতেই স্বাধীন এলো তার কাছে। রাজন্যা ভাবলো, স্বাধীন বুঝি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার কাছে ফিরে এসেছে। মনটা আনন্দে নেচে উঠল। স্বাধীন আজ কতদিন পর তার কাছে এসেছে। আর কি দূরে থাকা যআয়!না, না ফেরাবে না স্বাধীনকে, ও যা চাইবে তাই মেনে নেবে। রাজন্যার মানসিক অস্থিরতার কুয়াশা  নিমেষে ভেদ করে স্বাধীন বলে ওঠে-

         -তুমি আমায় মুক্তি দাও। বলো আমাকে ডিভোর্স দেবে?

         - হ্যাঁ, তাই দেবো।

বলতে ভীষণ কষ্ট হলো, আরও একবার স্বাধীনের কাছে প্রতারিত হলো। সেই ভালো। সেও মুক্তি চায়। এই নরক যন্ত্রণা থেকে একা থাকা ঢের ভালো।


         রাজন্যাকে পাগল করার চক্রান্ত করেছিল মা ছেলে মিলে, বাস্তবে পাগল হয়েছে কামিনী। তার পাগলামি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কোনভাবেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছে না। মুখ দিয়ে আগুন ছুটছে। এ আগুন প্রতিশোধের। অন্ধ হয়ে গেছে সে। রাজন্যাকে এ বাড়ি থেকে না তাড়ানো পর্যন্ত সে থামবে না। শুধু তাই নয় তার সাথে ডিভোর্স নিয়ে চিরদিনের মতো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিলে তবেই সে শান্ত হবে। মন্দের ভালো এটুকু জানা গেছে এতক্ষণের চেষ্টায়। ঝড়ের মত এসেছিল, একটা দিন সময় দিয়ে ঝড়ের মত বেরিয়ে গেছে রাজন্যাকে এবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার নোটিশ ঝুলিয়ে। নাহ্ মা'ছেলের কসরত মাটি হয়ে গেলো! রাজন্যাকে এখানে আর রাখা যাবে না। কিন্তু তাকে কেমন করে বলবে এখান থেকে চলে যেতে? স্বাধীন অজান্তেই কাজ এগিয়ে রেখেছে ডিভোর্স চেয়ে, রাজন্যা রাজি হয়েছে। এখন এখান থেকে যেতে বলার সুযোগ হাতড়ে বেড়াচ্ছে। এমনটা তো বলা যেতেই পারে- "বউমা চলো, তোমার নতুন ফ্ল্যাট থেকে ঘুরে আসি..."মায়ের কথাটা লুফে নিল নিল স্বাধীন। হ্যাঁ, হ্যাঁ এটাই একমাত্র উপায়। রাজন্যার কাছে এবার দুজনে মিলে এসে তার মাধবপুরের ফ্ল্যাটে বেড়াতে যাওয়ার কথা বললো। রাজন্যাও পালাবার একটা রাস্তা পেলো। ঈশ্বর তাকে এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিলেন বোধহয়। অন্তত ঘৃণ্য চক্রান্ত থেকে নিষ্কৃতি দিলেন।


               -এরপর আগামী সপ্তাহে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ