Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি / রঙ্গনা পাল/ পর্ব-৩৬


ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি  / রঙ্গনা পাল/ পর্ব-৩৬


"ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান

তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,

আমার আপনহারা প্রাণ,

আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ

তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,

ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান.."


       অনেক সময়ের ব্যবধানে রবিঠাকুরের গান গাইতে পেরে মনটা নেচে উঠলো স্বাধীনতার সুখে। মাধবপুরের এই ফ্ল্যাটটায় পুবে একটা ঘর, পশ্চিমে আরেকটা। ঘরটার পাশে বড়সড় বাথরুম আর তার পাশেই লম্বা মতো রান্নাঘর পুব আর পশ্চিমের ঘরের মাঝে প্রশস্ত ড্রয়িং। সুরম্য সোফার সামনে মর্ডান সেন্টার টেবিল শোভিত ড্রয়িংটা একটু একটু করে আগেই গুছিয়ে রেখেছিল রাজন্যা। এখানে পাকাপাকি চলে আসার কথা ভেবেই সমস্ত এক এক করে আয়োজন করে রেখেছিলো। ভালোলাগা বই, মনোরম পেন্টিং আর দারুণ সব প্রোট্রেট সঙ্গে সযত্নে সোকেসে সাজানো টেরাকোটা শোভা পাচ্ছে ড্রয়িং-এ। পশ্চিমের ঘরটায় দক্ষিণে একটা জানালা আছে। ঘরটা ছোট কিন্তু সবুজে সবুজ চারপাশটা। গায়ে গায়ে ঘর হলেও এই জানলা দিয়ে এক চিলতে মেঘ দেখা যায়। ফ্ল্যাটে রাজন্যা আর রাজর্ষিকে রেখে মা-ছেলে মিলে কাল-ই কাজের অজুহাতে এখান থেকে চলে গেছে। প্রথমটায় খারাপ লাগলেও রাতটা কেটেছে নিশ্চিন্তে। ছেলেটাও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। সকালে মায়ের গান গুনে মাকে জড়িয়ে অনেক আদর করে বলেছে, "আমরা এখানেই থাকবো মা, আর কোথাও যাবো না। আর তুমি রোজ গান শুনিয়ে আমার ঘুম ভাঙাবে" রাজন্যা ছেলেটাকে এতো উৎফুল্ল হতে আগে কখনও দেখেনি, সে বলে-

          -এই ঘরটা তোমার ভালো লেগেছে সোনা?

          -খুব ভালো লেগেছে।

           -ঠাম্-দাদাই-বাবা-কাকাইদের মিস করছো না?

           -না...

ছেলের মুখে 'না' এর দৃঢ়তায় আশ্চর্য হয়ে গেল রাজন্যা। মাত্র পাঁচবছরে আপন-পর চিনে ফেলেছে! 


      নিজের ঘরে বাস করার স্বাদ এক্কেবারে আলাদা। কোন কুণ্ঠা নেই, জোর করে কাউকে সমীহ করার চাপ নেই, কষ্ট করে কথা বলা, চলাফেরা করার বাধ্যবাধকতা নেই, সর্বোপরি সারাক্ষণ গঞ্জনার ভয় নেই। এখানে শুধুই স্বাধীনতা। ছেলেটাও বুঝে গেছে এখন থেকে আর উটকো ঝামেলার সম্ভাবনা নেই। সেই কারণে দক্ষিণের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বসন্ত বরণে নিজেকে সামিল করার উদ্দীপনা ফিরে পেয়েছে রাজন্যা। দখিনা বাতাস যে তাকে ছুঁয়ে ফেলেছে, বসন্ত সখার সুমধুর কণ্ঠ শুনে গান জেগেছে তার মনেও...একটা মুক্তির শ্বাসে ভেতরটা পালকের মতো হালকা হয়ে গেছে। একা একা পথ চলতে হয়তো তার অসুবিধে হবে, কষ্ট হবে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সামলে নিতে হবে নিজেকে। দুশ্চরিত্র স্বামীর চেয়ে একা থাকা ঢের ভালো। নিত্য নৈমিত্তিক অশান্তিতে শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিলো। সবচেয়ে বড় কথা পদে পদে সম্মানহানি হচ্ছিল তার। শ্বশুরমশাই-এর কথা মনে পড়ছে। একমাত্র এই মানুষটি কখনো তাকে অসম্মান করেনি, বারেবারেই সাবধানতার বাণী উচ্চারণ করেছেন। রাজন্যা এত অসম্মান সয়েও শাশুড়ির প্রতি কখনও বিদ্বেষী হতে পারেনি। পারলে হয়তো ওদের সাহস পরাৎপর বাড়তো না। নিজেদের স্বার্থপূরণের জন্য হোক বা কামিনীর মন রাখার জন্য হোক আজ রাজন্যাকে তার নিজের ফ্ল্যাটে নির্বাসন দিয়ে অজান্তেই হাজার খারাপের মাঝে একটা ভালো কাজ করে গেলো ওরা। মানসিক কষ্টের চাপে পড়ে পাগল হতে যাওয়া রাজন্যা মাত্র একটা রাতের অবসানে সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে নতুন করে প্রকৃতির কোলে গেয়ে উঠেছে। গান শুনে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষজন জানলা খুলে সৌজন্য বিনিময় করে ফেলেছে।


          পাশের ফ্ল্যাটের মানুষগুলো খুব আলাপি এবং ভালো। শমিক লাবণ্য আর তাদের মেয়ে মিমিকে নিয়ে তাদের পরিবার। শমিক মাধবপুর শিশু নিকেতনের শিক্ষক। রাজন্যা ভেবেছে শমিকবাবুর স্কুলেই রাজর্ষিকে ভর্তি করে দেবে সেন্ট মাইকেল থেকে এল কে জি করার পর প্রায় একবছর স্কুলে যেতে পারেনি নানা সমস্যার কারণে। এখন স্কুলের নামেই তো তার এলার্জি। কিন্তু ভয় কাটিয়ে সুশিক্ষিত করতে হবে ছেলেকে। তার তো ডিউটির ঠিক নেই। সবার প্রথমে একটা সারাদিনের কাজের মেয়ে আর একটা রান্নার মেয়ে ঠিক করতে হবে। কাল রাত থেকে শুকনো খাবার দিয়ে চালিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে আনা খাবারগুলোর প্যাকেট খোলেনি। এখন রান্নার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাগ্যিস অনেক আগে থেকেই কিছু কিছু জিনিসপত্র স্টক করে রেখেছিলো ওরা জানতেই পারেনি। এখানে এসে সাজানো গোছানো ঘর দেখে বেশ অবাক হয়েছে। স্বাধীন অবশ্য বলে গেছে খুব তাড়াতাড়ি ফিরবে। সব আগের মতো হয়ে যাবে। চিন্তা ভাবনা করতে নিষেধ করে গেছে।আরো বলেছে, কিছুদিন কষ্ট করে চালিয়ে নিতে। রাজনীতি জানে তার কথাগুলো বর্ণে বর্ণে মিথ্যে। আজ আর মান অভিমানের কোন মানে হয় না। জোর করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখায় তার রুচি নেই। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি ছেলেকে একটা সুস্থ পরিবেশ দেওয়া। ছেলেটাকে যে দেখবে তার-ই অস্বাভাবিক লাগবে। তার বনেদি বংশ বাবা ও মা চাকুরিজীবী। তবু ছেলেকে সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ দিতে অপারগ। এই অবস্থায় প্রাথমিক প্রয়োজন ছেলেকে আগলে রাখা‌। রাজন্যা যতই ভাবে স্বাধীনের কথা ভাববে না, তবু সমস্তের কাজের মাঝে সমান্তরাল রেখার মতো সে এসে যায়।


     কিছু আনাজপাতি, মাছ মাংস ডিম ইত্যাদি কিনে আনার জন্য রাজর্ষিকে লাবণ্যদের কাছে রেখে বেরিয়ে পড়লো রাজন্যা। একবার হাসপাতালে যেতে হবে। অন্ততঃ সাতদিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে আনতে হবে। ছুটি মঞ্জুর না হলে বিনা বেতনেই ছুটি নেবে বরং। রাস্তায় দেখা হলো কুন্তলদার সাথে। সাথে একজন অপরিচিতা। রাজন্যার প্রশ্ন-

            -এদিকে কোথায়?

            -এই ম্যাডামের ডাকে একটা সাহিত্য সভায় যোগ দিতে এসেছি। তুমি এখানে?

            -এখানে ফ্ল্যাট নিয়েছি।

            -ওমা! এখানে তো আমার ভাই-এর বাড়ি। আমি মাঝে মাঝেই আসি।

            -তাহলে আমার ফ্ল্যাটে এসো..

            -আজ না...অন্য কোনদিন। ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দাও ...

            -ওঁর সাথে পরিচয় করে দিলে না..

          -হ্যাঁ, ওঁর বাড়ি বর্ধমানে। ফে.বুতে আলাপ। সুপ্রীতি সরকার। বেশ ভালো লেখেন। এক-আধটু লেখালেখি করি আমিও... তাই এক সম্মেলনে এঁর সাথে পরিচয় হলো। ওঁকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আমি ভাই-এর বাড়ি চলে যাবো।


            ----এরপর আগামী সপ্তাহে.....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ