Header Ads Widget

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি (Reg No:1900200271/2023)

ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি , রঙ্গনা পাল ,পর্ব-৪৭




ঘর বেঁধেছে ঝড়ের পাখি , রঙ্গনা পাল ,পর্ব-৪৭

        আকাশ জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে। থেকে থেকে হৃদয়ফাটানো মেঘগর্জন। ভরদুপুরকেও মনে হচ্ছে গভীর রাত, এতটাই দাপট কালবৈশাখীর। বিদ্যুৎ-এর ঝলকানিও চোখধাঁধানো। মেন্টাল ওয়ার্ডের বাচ্চা থেকে বয়ষ্ক প্রত্যেকেই ভীত। এমন দুর্যোগ মাথায় নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে একটা  ছেলে। রাজন্যা দূর থেকে দেখে আন্দাজ করলো ছেলেটার বয়স তেরো-চোদ্দ হবে। কিন্তু বাড়ির লোকেরা কেমন যে এই বাচ্চাটাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ছেলেটা কাছে আসতেই রাজন্যা মৃদু ধমকের সুরে বললো-
         -এখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছো কেনো?
          -মায়ের ওষুধ নিতে এসেছি।
          -বৃষ্টি থামলে আসতে পারতে‌
          -বেরোবার সময় বৃষ্টি পড়ছিল না, কেবল ঝড় উঠেছিল।
          -ঝড়ের মধ্যেই বা বেরোলে কেনো?
          -মা বললো, বৃষ্টির আগেই ছুটে গিয়ে ওষুধ নিয়ে আসতে। তাই-
           -কেমন মা তোমার? জানেন না যেকোন মুহূর্তে যা কিছু হতে পারে। একদম ভিজে গেছো। তোমার তো অসুখ করবে।
            -আমার কিছু হবে না।
 পলিথিনের মধ্য থেকে প্রেসক্রিপশন বের করে রাজন্যার হাতে দিয়ে ছেলেটি বলে-
          -ওষুধগুলো দিয়ে দিন, আমাকে ফিরতে হবে।

       সত্যি ওই দুর্যোগ মাথায় নিয়ে পলিথিনের মধ্যে ওষুধ ভরে দুর্যোগের মধ্যেই চলে গিয়েছিল ছেলেটি। ওর চোখে ভয় দেখেছিল রাজন্যা‌। এরপরও মাঝে মাঝে এসেছে মায়ের ওষুধ নিতে কিন্তু কোনদিন নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে চায়নি। উৎকণ্ঠা থাকলেও কিছুই করার ছিলো না রাজন্যার। প্রায় বছর চারেক পর সেই ছেলেটিই রাজন্যার কাছে এসে কেঁদে ফেলে। এই প্রথম ছেলেটিকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখলো রাজন্যা। ছেলেটির নাম শিশির সরকার। সে নিজস্ব মেধায় আই আই টি তে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে কিন্তু ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় ক'টা টাকা তার বাবা মা দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। পাগলের মতো ছুটে এসেছে সে রাজন্যার কাছে। আজ গড়গড় করে সমস্ত কথা বলে যাচ্ছে, সে তার বাবা মা'র ঔরসজাত নয় অনাথ আশ্রম থেকে তাকে তার পালিত বাবা মা নিয়ে এসেছিলো। কারণ তখন তারা নিঃসন্তান ছিলেন। ছোট থেকে বড় আদরেই মানুষ হয়েছে সে। শিশিরের বয়স যখন দশ বছর তখন একটি ফুটফুটে মেয়ে আসে বাবা মার কোল আলো করে। তখন থেকেই ওরা অন্ধকারে ঠেলে দেয় শিশিরকে। এতদিন মুখ বুজে পালিত মা'র অত্যাচার নীরবে সহ্য করেছে শিশির। সময়ে অসময়ে পড়াশোনায় ডুবে থেকেছে। সুযোগ পেয়েছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অথচ ভর্তির টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে ভেবে পাচ্ছে না।

         রাজন্যা নিজের ছেলের মতোই সস্নেহে শিশির মাথায় হাত রেখে বলে-
          -তুমি চিন্তা করো না, ভর্তির টাকা আমি দেবো 
          -সত্যি বলছেন? আমি ভর্তি হতে পারবো? আমি পড়ার সুযোগ পাবো?
          -নিশ্চয় পাবে। তোমার স্বপ্ন সফল করার জন্য আমি তোমার সাথে থাকবো।
           -আপনি আমায় বাঁচালেন। আমি আবার নতুন করে নিজেকে গড়ার সুযোগ পেলাম। প্রকৃত মায়ের মতো আশ্বস্ত করলেন আমায়।
         -আজ থেকে তুমিও আমার আরেকটা ছেলে। তোমার সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন সমস্ত বলবে, কোন সংকোচ করবে না। আমি সবসময় তোমার পাশে থাকবো।

        এভাবেই সকলের পাশে থাকতে চায় রাজন্যা। একটা ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিন্তের আশ্বাস দিতে পেরে স্বস্তি পেলো খানিকটা। প্যাভলভে আসার পর মানুষের সুখ দুঃখের সঙ্গী হতে পেরে অনেকটা ভালো আছে সে। নিজের দুঃখ কষ্টে আর ব্যথিত হয় না। প্রাপ্তি -অপ্রাপ্তির ঝুলিতে কী আছে বা নেই সে নিয়েও কোন দুশ্চিন্তা করে না। সারাদিন প্যাভলভে কাটিয়ে বাকি সময়টা ছেলে আর ঠাকুরদের নিয়ে কেটে যায় নির্বিঘ্নে। দিনগুলো স্বাধীনকে ছাড়াই সুন্দর ভাবে কেটে যাচ্ছে। কখনও সে আসে, আবার দীর্ঘসময় তার অনুপস্থিতিও আর পীড়া দেয় না রাজন্যাকে। ছেলেটাও চোখের সামনে অনেকখানি বড় হয়ে গেলো। বাবার আদর যত্ন না পেতে পেতে একরকম সয়ে গেছে রাজর্ষির। সেও বাবাকে নিয়ে মা'কে কোন প্রশ্ন করে না, নিজেও বাবার সাথে তেমন যোগাযোগ করার চেষ্টা করে না। রাজন্যার সংসারে স্বাধীন পারিবারিক, সামাজিক, আর্থিক সকলপ্রকার দায়মুক্ত। জীবনের বাকি সময়টাও হয়তো রাজন্যার প্রতি উদাসীন থেকেই কাটিয়ে দেবার সংকল্প নিয়েছে স্বাধীন।

      শ্বশুরবাড়ির সাথে তেমন কোন সম্পর্ক নেই, ওরাও রাজন্যার কোন খোঁজ নেয় না। ছেলে স্বাধীনের খোঁজ নেয় কিনা জানা নেই রাজন্যার। রাজন্যা শুনেছে কলকাতায় সব বড় বড় ফ্লাটে থাকে তাদের দেবরেরা। সবাই তাদের সম্পত্তি বুঝে নিয়েছে মা-বাবার কাছ থেকে। শ্বশুরবাড়ি থেকে কানাকড়িও ভাগ পায়নি একমাত্র রাজন্যা। সে চায়ও না, জীবনে তার সম্পদের চেয়েও শান্তির প্রয়োজন বেশি। তাই সমস্ত শোনার পরও   কোনরকম অস্থিরতা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। হঠাৎ এক রবিবার খুব সকালে শাশুড়িকে তার ফ্ল্যাটে আসতে দেখে চাপে পড়ে গেলো রাজন্যা। শাশুড়িকে বেশ গম্ভীর এবং চিন্তাগ্রস্ত মনে হলো। কী হলো আবার! উনি যতবার এসেছেন ঝড় সাথে করে এনেছেন! এখন আবার কী মতলব কে জানে! উফ্ কখন যে মুখ খুলবেন কে জানে! কৌতূহল বেশিক্ষণ চেপে রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি বেশ গুমোট।

           -এরপর আগামী সপ্তাহে....

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ